অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা : জাহালম

শাহরিয়ার আরিফ

হ্যালো..।

আপনে কি শাহরিয়ার আরিফ?

হ্যা, বলেন….

আপনি কি যমুনা টিভির সাংবাদিক?

আপনি কি বলতে চান, বলেন…

আমার ছোট ভাই জাহালম… দুদকের ৩২ মামলায় দুই বছর ধইরা বিনা অপরাধে জেল খাটতেছে।

আপনার ভাই কি করেছে?

ব্যাংকের সাড়ে আঠারো কোটি টাকা আত্নসাত করছে বইলা বলতাছে।

ব্যাংকের টাকা নিলে আপনার ভাই নিরপরাধ হলো কি ভাবে?

বিশ্বাস করেন…, আমার ভাই এর কিছুই জানে না….।

আপনি আমার নাম্বার পেয়েছেন কোথায়?

কোর্টের একজন উকিল দিছে…….

এভাবেই ২০১৭ সালের শেষ দিকে প্রথম কথা হয় জাহালমের ভাই, শাহানুর মিয়ার সাথে। তারপর তিনি সেই দিনই অফিসে আসেন। (অফিসে বলতে চ্যানেল ২৪ এর অফিস। এই ফোন আসার কয়েক মাস আগে যমুটা টেলিভিশন ছেড়ে নতুন কর্মস্থল চ্যানেল ২৪ এ যোগ দেই।)তখন শাহানুর মিয়া চ্যানেল ২৪ এর অফিসে আসেন। অফিসে আসার পর তিনি তার ভাই জাহালমের মামলা ও জেল জীবনের নানা বর্ণনা দেন। তখন তার কথায় পুরো বিষয়টা আমার কাছে পরিস্কার হয়নি। পরে জাহালমের আইনজীবী এডভোকেট লুৎফুল কবিরের সাথে আমাকে কথা বলিয়ে দেন। আমি তখন সেই আইনজীবীকে এই মামলা সংক্রন্ত সকল কাগজপত্রের এক সেট ফটোকটি দিতে বলি।

সেইদিনই শাহানুর মিয়ার বাড়ি যাওয়ার কথা থাকলেও, তিনি ঢাকাতেই থেকে যান। পরের দিন শাহানুর মিয়া তাদের আইনজীবীর সহায়তায় আমাকে মামলা সংক্রন্ত প্রায় সকল কাগজের এক সেট ফটোকপি সর্বরাহ করেন।

পরে আমি মামলার কাগজগুলো পড়ে বুঝার চেষ্টা করি। তখন এই ঘটনার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ননা আমার টিম লিডার জিএম ফয়সাল আলমের সাথে আলাপ করি। তখন ঘটনাটির একটি ছক এঁকে ফেলি। ঘটনাটা এমন যে, একদিকে এতগুলো মামলা আদালতে বিচারাধীন এবং শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অন্যদিকে দুদকের মতো একটা প্রতিষ্ঠানের করা তদন্তে যাবে বলা হয়েছে প্রধান আসামী, আর তাকেই আমরা বলতে যাচ্ছি ভিক্টিম। তাই বিষয়টা স্মর্শকাতর হওয়ায় টিম লিডার আমার কাজ শুরুর আগে অফিসের উদ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে অনুমতি নিয়ে দেন।

শুরু হলো সোনালী ব্যাংক মিরপুর ক্যান্টমেন্ট শাখার সাড়ে আঠারো কোটি টাকা আত্নসাতের ঘটনার প্রধান আসামী আবু ছালেক @ জাহালমকে নিয়ে অনুসন্ধান।অনুসন্ধানের শুরুটাই ছিল টাঙ্গাঈলের নাগরপুরে জাহালমদের বাড়ি থেকে।সেখানে যাওয়ার পরই অনুসন্ধানের প্রথম ভিত্তি স্থপন হয়। সাড়ে আঠারো কোটি টাকা আত্নসাৎকারীর বাড়ি ও স্বজনদের চেহারা দেখেই বুঝা গেছে, এর পেছনে একটা বড় ধরনের নাটক রয়েছে।

এরপর ঘটনার সাথে জড়িত সোনালী ব্যাংক মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট শাখার সাব সাপোর্টিং স্টাফ মাঈনুল ইসালামের বাড়িতে যাই। সেখান থেকে মানিকগঞ্জে আমিনুল হক @ হক সাহেব @ হক চোরার বাড়িতে যাই। তার সম্পদের সচিত্র তথ্য সংগ্রহ করি। সেখান থেকে ব্যাংকে আবু ছালেকের দেয়া ঠিকানা ধরে জামালপুরের সরিষাবাড়ি যাই। সব কিছু মিলিয়ে মামলার চার্জশীটে পাওয়া তদন্তের ফাঁকফোকর তুলে ধরে ০২/০২/২০১৮ ইং তারিখে অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান সার্চলাইটে পর্ব-৯ এ ‘উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে’ প্রচার করা হয়।

এই পর্বটি প্রচারের পর ঠাকুরগাঁও থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তি অফিসের নাম্বারে ফোন করে আমার সাথে কথা বলতে চান। পরে তিনি আবারো ফোন দিলে তখন আমি অফিসে উপস্থিত থাকায় সেই অজ্ঞাত ব্যক্তির সাথে কথা হয়। তিনি তখন আমাকে জানান, আমাদের প্রতিবেদেনে দেখানো আবু ছালেকেরে বাড়ি ঠাকুরগাঁও এর ভূল্লী বাজারের পাশে। তখন আমি অফিসকে বিষয়টা জানিয়ে বলি,আমাকে ঠাকুরগাঁও পাঠানোর ব্যবস্থা করতে। আমি সেইদিন রাতেই ঠাকুরগাঁও এর উদ্দেশ্যে রওনা হই। পরের দিন দুপুর নাগাদ আবু ছালেকের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছাই। তারপর সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগীতায় আবু ছালেকের সম্পদের (জায়গা-জমি,দোকান) সন্ধান বের করি এবং সচিত্র প্রতিবেদন সংগ্রহ করি। সেখানে আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে তার বাবা-মাসহ আত্নীয়-স্বজনরা পালিয়ে যান। পরে সেখানে দুইদিন অবস্থান করে কৌশলে আবু ছালেকের বাবা-মা ও চাচার সাথে কথা বলি। তখন তার বড় দুই বোন ও বোনের জামাইদের সাথেও দেখা করে কথা বলি। তখন স্থানীয় মেম্বার ও চেয়ারম্যানের সহায়তায়আবু ছালেকের ভোটার নাম্বার সংগ্রহ করে চলে যাই ঠাকুরগাঁও জেলা নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে। সেখান থেকে ভোটার নাম্বার দিয়ে আবু ছালেকের জাতীয় পরিচয় পত্রের নমুনা কপি সংগ্রহ করি। এরপর ঢাকায় এসে ২৩/০২/২০১৯ ইং তারিখে অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান সার্চলাইটে পর্ব-১২ এ ‘উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে-২’ প্রচার করা হয়। যেখানে জাহালমের পাশাপাশি প্রকৃত আবু ছালেক ও তার সম্পদের বিস্তারিত দেখানো হয়।

এরপর নড়েচড়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাৎক্ষণিক জাহালমের মামলার শুনানীতে অংশ নেয়া বন্ধ করে দেয় দুদক। এরপর ১৭/০৪/২০১৮ তারিখে মামলাগুলো অধিকতর তদন্তের জন্য দুদক কমিশন কর্তৃক সিদ্ধান্ত নিয়ে চিঠি দিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে মামলার কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।

মামলাগুলো পুনঃরায় তদন্ত শুরু করার জন্য দুদক মামলাগুলোর নথি আদালত থেকে ফিরিয়ে নেয়ার একমাস প্রায় পর ২৪/০৫/২০১৮ তারিখে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের সার্চলাইটে দেখানো প্রতিবেদনের সত্যতা পেয়ে একটি প্রতিবেদন দেয়।জাহালম আর আবু ছালেক একই ব্যাক্তি নয়। এটি পরিস্কার হওয়ার পরও জাহালমের জামিন মিলেনি। তবে, দুদকের নতুন তদন্ত ছিল চলমান।

২০/১২/২০১৮ তারিখে জাহালমকে নির্দোষ উল্লেখ করে তার নাম মামলা থেকে প্রত্যাহার করে আদালতে সম্পূরক চার্জশীট জমা দেয় দুদক। এর প্রেক্ষিতে ০৩/০১/২০১৯ তারিখে ৪টি মামলা থেকে অব্যাহতি পান নিরিহ জাহালম। হাইকোর্টের নির্দেশে ০৩/০২/২০১৯ দিবাগত রাত ১ টায় কারামুক্ত হন জাহালম।

আমার টেলিভিশন অনসন্ধানী সাংবাদিকতার একটি অধ্যায়ের নাম জাহালম। জাহালমরা বেঁচে থাকুক। বেঁচে থাকুক মানবতা।

লেখক, শাহরিয়ার আরিফ, স্টাফ রিপোর্টার  (ক্রাইম এন্ড ইনভেষ্টিগেশন), চ্যানেল ২৪।

সাবেক প্রশিক্ষণ ও গবেষণা সম্পাদক, ক্র্যাব।

5 thoughts on “অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা : জাহালম

  • October 13, 2019 at 12:41 pm
    Permalink

    Hi, very nice website, cheers!
    ——————————————————
    Need cheap and reliable hosting? Our shared plans start at $10 for an year and VPS plans for $6/Mo.
    ——————————————————
    Check here: https://www.good-webhosting.com/

  • January 15, 2020 at 6:12 pm
    Permalink

    Hello there, I found your website via Google while searching for a related topic, your web site came up, it looks great. I have bookmarked it in my google bookmarks.

  • January 25, 2020 at 4:00 am
    Permalink

    Way cool, some valid points! I appreciate you making this article available, the rest of the site is also high quality. Have a fun.

  • January 25, 2020 at 11:28 am
    Permalink

    It’s arduous to seek out educated individuals on this topic, however you sound like you realize what you’re talking about! Thanks

Leave a Reply

Your email address will not be published.