সন্ত্রাসবাদ ও গণমাধ্যম

মনিরুল ইসলাম

সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করতে পারে। যদিও গণমাধ্যমের ভূমিকা কি হবে সে বিষয়ে নানাধরনের মতদৈ¦ততা রয়েছে। কট্ররপন্থিরা মনে করে গণমাধ্যম সন্ত্রাসবাদকে উসকে দেয়। আবার অন্য পক্ষ মনে করে গণমাধ্যমের ভূমিকা ছাড়াই সন্ত্রাসবাদের উত্থান এবং বিস্তার ঘটে। সন্ত্রাসবাদকে উসকে দেয়া নয় গণমাধ্যমের যথাযথ ভূমিকা সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রনের ক্ষেত্রেই অধিকতর কার্যকর হতে পারে। কেউ কেউ আবার গণমাধ্যম ও সন্ত্রাসবাদের মধ্যে একটি পরিপূরক ( Simbiotic ) সম্পর্ক খোঁজারও চেষ্টা করে থাকেন। এই প্রবন্ধে গণমাধ্যম ও সন্ত্রাসবাদের সম্পর্ক নির্ধারন করতে গিয়ে মূল তিনটি বিষয়ে আলোকপাত করা হচ্ছে-
প্রথমত: সন্ত্রাসবাদীরা গণমাধ্যমের কি ভুমিকা প্রত্যাশা করে এবং তা থেকে কি কি ভাবে উপকৃত হতে পারে। 
দ্বিতীয়ত: গণমাধ্যম কর্মীরা কিভাবে সন্ত্রাসবাদকে উপজীব্য করে তাদের সংবাদের চাহিদা তৈরীর মাধ্যমে দর্শক-শ্রোতা-পাঠকদের আকৃষ্ট করতে পারে।
তৃতীয়ত: সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রনের ক্ষেত্রে কিভাবে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করা যেতে পারে।
সন্ত্রাসবাদ ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক নিরূপনের লক্ষ্যে সন্ত্রাসবাদের একটি প্রচলিত সংজ্ঞা আলোচনা করা প্রাসঙ্গিক। যদিও সন্ত্রাসবাদের কোন সর্র্বসম্মত বা সর্বজনস্বীকৃত কোন সংজ্ঞা নেই। তথাপি এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সংস্থা এবং ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত সংজ্ঞা বিশ্লেষণে সন্ত্রাসবাদের কতগুলো মৌলিক বৈশিষ্ট্য বা উপাদান চিহ্নিত করা যায়। যেমন- ১) সন্ত্রাসবাদ একটি বেআইনি সহিংস আচরন বা ঘটনা, ২) রাষ্ট্রযন্ত্র নয় বরং নিরপরাধ মানুষকে আক্রমনের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়, ৩) এটি একটি পরিকল্পিত আচরণ বা ঘটনা যা কোনভাবেই তাৎক্ষনিক নয়, ৪) এর একটি বা রাজনৈতিক কিংবা মতাদর্শিক উদ্দেশ্য থাকে, ৫) এটি সংঘটিত হয় মতাদর্শিক উদ্দেশ্য পূরণে সংকল্পবদ্ধ কোন গোষ্ঠী যাদের সাথে রাষ্ট্র বা সরকারের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই ।
জাতিসংঘের সাধারন পরিষদ কর্তৃক গৃহিত সংজ্ঞা অনুযায়ী- Terrorism can be seen as criminal acts intended as calculated to provoke a state of terror is the general public, a group of persons or particular persons for political causes, whatever the consideration of a political, philosophical, ideological , racial, religious or other nature that may be invoked to justify them.

অন্যদিকে FBI প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী,  `Terrorism is the unlawful use of force against person or property to intimidate  or coerce the civilian population or any segment thereof in furtherance of political or social objectives.`

দু‘টি সংজ্ঞা বিশ্লেষনেই দেখা যাচ্ছে যে, সন্ত্রাসবাদীদের রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক কিংবা অন্য কোন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের একটি লক্ষ্য থাকে। এ প্রসঙ্গে Nacos তার Mass-Mediated Terrorismগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, বেশিরভাগ সন্ত্রাসবাদীরাই তাদের লক্ষ্য নির্ধারনের ক্ষেত্রে তাদের কাজ মিডিয়াকে কতটা আকর্ষনে সফল হবে তা বিবেচনায় নিয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে তিনি Triangle  of political communication’ নামে একটি ছক তৈরীর মাধ্যমে দেখিয়েছেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য জনগণের কাছে পৌছানোর জন্য মিডিয়া বা গণমাধ্যমকে কিভাবে ব্যবহার করা হয়। সন্ত্রাসবাদীরাও সন্ত্রাসী কার্যের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারনের ক্ষেত্রে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে- অর্থাৎ মিডিয়া কোন বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করবে তা বিবেচনায় নিয়ে থাকে।

Alexander Spence এর মতে, কাউকে হত্যা কিংবা সহিংস ঘটনা ঘটানোই সন্ত্রাসবাদের মূল লক্ষ্য নয়, বরং জনগণের মাঝে ভীতি ছড়িয়ে দেয়া এবং তাদের উদ্দেশ্যকে প্রচারের উপজীব্য করে তোলাটাই মূল লক্ষ্য। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমেকে কেউ কেউ সন্ত্রাসীদের Ôaccomplice’ বা দোসর বলে থাকেন (Prof. Schmid) কিংবা তাদের পরম বন্ধু (Prof. Hoffman) এছাড়াও গণমাধ্যমকে সন্ত্রাসবাদের ‘অক্সিজেন’ হিসেবে অভিহিত করা হয় (Prof. Margaret Thatcher )।

Alexander Spence সহ বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, সন্ত্রাসবাদীরা মিডিয়াকে তাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে তিনটি উপায় ব্যবহার করতে চায়-

প্রথমত: সন্ত্রাসবাদীরা জনগনের দৃষ্টি আকর্ষন করতে চায়- আর এ উদ্দেশ্য পূরনে প্রধান সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে গণমাধ্যম। সন্ত্রাসবাদীদের লক্ষ্য কখনোই একটি জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশকে হত্যা করা নয় বরং হিংসাত্মক দু‘একটি ঘটনার মাধ্যমে কতিপয় ব্যক্তিকে হত্যা করে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের দৃষ্টি আকর্ষন করাই তাদের মূল লক্ষ্য। এক্ষেত্রে স্বল্পসংখ্যক আক্রমন পরিচালনার মাধ্যমেই তারা মিডিয়াকে ব্যবহার করে জনগনের দৃষ্টি আকর্ষনে সক্ষম হয়।

দ্বিতীয়ত: দৃষ্টি আকর্ষনের মাধ্যমে তাদের কাজের প্রতি বিপুল সংখ্যক মানুষের সমর্থন ও সহানুভূতি আদায়ের লক্ষ্যেও তারা গণমাধ্যমের আশ্রয় নেয়।

তৃতীয়ত: সন্ত্রাসবাদীরা গণমাধ্যমের প্রচারকে পুজি করে জনসাধারনের মাঝে ভীতি ছড়িয়ে মতাদর্শিক বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্খা পোষণ করে । এক্ষেত্রে এই তিনটি উদ্দেশ্যের মধ্যে প্রথম এবং তৃতীয় উদ্দেশ্য সফল হলেও দ্বিতীয় উদ্দেশ্য অর্থাৎ জনগনের সমর্থন ও সহানুভূতি আদায়ে সফলতার বিষয়টি এ পর্যন্ত কোন গবেষনায় প্রমানিত হয়নি।

Bruce Hoffman সুনির্দিষ্টভাবে বলেছেন যে, গণমাধ্যমে প্রচারনার কারণে কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রতি জনগনের সহানুভুতি বৃদ্ধির কোন প্রমান পাওয়া যায়নি। RAND Corporation ১৯৮০ সালে পরিচালিত তাদের এক গবেষনায় দেখিয়েছে যে, সন্ত্রাসী কর্তৃক বিমান ছিনতাইয়ে গণমাধমে ব্যাপক বিবরণ প্রচার হলেও ঐ সময় কোন সাধারন মানুষের সন্ত্রাসীদের প্রতি কোন সমর্থন তৈরী হয়নি।
Wilkinson বলেছেন যে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সমূহকে এর অপব্যবহারের সুযোগ তৈরী করে দেয়। সন্ত্রাসবাদীরা যেহেতু জনমানুষের দৃষ্টি আকর্ষনপূর্বক তাদের মনোজগতে পরিবর্তন আনতে চায় সেক্ষেত্রে তারা সমসাময়িক মিডিয়াকে Propaganda war এর  Platform হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তারা তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্যই গণমাধ্যমের প্রচারকে কাজে লাগাতে চায়। এক্ষেত্রে তারা ৪টি লক্ষ্য অর্জনের জন্যই এ প্রচার যুদ্ধ চালায়-
১. উদ্দেশ্যকে কাজে পরিণত করার মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণকৃত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক ভীতি সঞ্চার করা।
২. তাদের কর্মকান্ডের ন্যায্যতা ও সাফল্য লাভের অনিবার্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বৃহত্তর স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করা।
৩. সরকার তথা নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপকে অকার্যকর করা।
৪. সমমনা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সমর্থন আদায়ের মাধ্যমে তাদের জনবল বৃদ্ধি, অর্থায়ন ও লজিস্টিক সাপোর্ট বৃদ্ধি করা।
গণমাধ্যম যেভাবে উপকৃত হয়- প্রায় দু‘শো বছর আগে টমাস জেফারসন মন্তব্য করেছিলেন – (When the press is free all are safe) কিন্তু ২০০৮ সালে ইউরোপিয়ান কমিশনের অর্থায়নে পরিচালিত 6th Framework program এ পাল্টা যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। এখানে গণমাধ্যম যদি কোন সন্ত্রাসীগোষ্ঠী কর্তৃক প্রভাবান্বিত হয়ে এমন কোন কন্টেন্ট পরিবেশন করে যা জনশান্তি বিনষ্টের উদ্দেশ্যে প্রচারিত, তাহলে কি প্রতিক্রিয়া হয় সে বিষয়ে আলাকপাত করা হয়েছে।
মুক্ত স্বাধীন গণমাধ্যমের কাজ হল বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ জনগনের কাছে পরিবেশন করা। কোন সংবাদ কতটা আকর্ষনীয় করে অধিকসংখ্যক পাঠক-শ্রোতাকে আকৃষ্ট করা যায় সেটিই থাকে তাদের অন্যতম লক্ষ্য। তদুপরি, বর্তমানে গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে পারস্পারিক প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্ক থাকায় কে কার আগে কোন সংবাদটি উপস্থাপন করবে তা তাদের দৈনন্দিন কর্মকান্ডে প্রভাব ফেলে। এমনকি প্রতিযোগিতার ফলশ্রুতিতে তাড়াহুড়া করতে গিয়ে কোন সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা কিংবা যথার্থতা যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ না থাকলে সেটিও তারা প্রচারে আগ্রহী হয়। “ব্রেকিং নিউজ” প্রচারের মানসিকতা তাদের এ ধরনের সংবাদ পরিবেশনে অনুপ্রানিত করে। অনেক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী ঘটনা সরাসরি সম্প্রচারিত হওয়ার কারণে জিম্মি উদ্ধার অভিযান বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহনের লক্ষ্যে পরিচালিত ট্যাক্টিক্যাল অপারেশন ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়- মুম্বাই এর হোটেল তাজ-এ ২০০৮ সালের সন্ত্রাসী হামলা কিংবা ঢাকার গুলশানস্থ হোলি আর্টিসান রেস্টুরেন্টে ২০১৬ সালের সন্ত্রাসী হামলার “লাইভ টেলিকাস্টিং” এর ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।
কোন সহিংস ঘটনার বিশদ বিবরণ দিয়ে প্রচার করা হলে পাঠকদের মনে ঐ ঘটনার প্রতি আগ্রহ তৈরী হয় যা তাদেরকে অনুরূপ ঘটনা ঘটাতে অনুপ্রানিত করতে পারে। অসাবধানতাবশত: সন্ত্রাসীর ব্যক্তিগত বর্ণনা এবং কার্যাকলাপের বিবরণ উক্ত সন্ত্রাসীকে নিন্দিত না করে নন্দিত করতে পারে ফলে কেউ কেউ রোল মডেল হিসেবে বেছে নিয়ে তাকে অনুকরন করতে পারে।


ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী Michel Wieviorka সন্ত্রাসবাদ ও গণমাধ্যমের পারস্পারিক মিথোজীবিতার (Symbiosis) সম্পর্ককে নাকোচ করে যুক্তি উত্থাপন করেছেন। তার মতে, এ সম্পর্কের ৪টি রূপ রয়েছে-
১. সম্পূর্ন অনাগ্রহীতা- যখন সন্ত্রাসবাদীরা তাদের নির্ধারিত লক্ষ্য বস্তুর বাইরে কোন নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে উদ্যোগি হয় না কিংবা তাদের কর্মকান্ডের মাধ্যমে কোন প্রচারনা চালাতে আগ্রহী হয় না।
২. আপেক্ষীক অনাগ্রহীতা- সন্ত্রাসী হামলা বিষয়ক সংবাদের ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদীরা যখন অনাগ্রহী কিংবা উদাসিন।
৩. গণমাধ্যম নির্ভর কর্মকৌশল- সন্ত্রাসবাদীরা ভীতি সঞ্চারের জন্য গণমাধ্যমরে আশ্রয় নেয়।
৪. সম্পর্কচ্ছেদ- যখন সন্ত্রাসবাদীরা মিডিয়া কর্মী ও প্রকাশকদের শত্রু মনে করে ও আক্রমনের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করে।


সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে ধারণা তৈরীতে গণমাধ্যমের ভূমিকাঃ
বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপনের মাধ্যমে গণমাধ্যম জনমনে সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শন করে গণমাধ্যমই পারে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরী করতে। Cepulkauskaite এর মতে, গণমাধ্যম সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে জনসাধারনের ধারণা বিভিন্নভাবে পরিবর্তন করতে পারে- 
১. সন্ত্রাসবাদকে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপনঃ সন্ত্রাসবাদী হামলা সম্পর্কে সংবাদ উপস্থাপনের পূর্বে নিরপরাধ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের সহিংসতার কারণ ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন। সন্ত্রাসবাদীদের উদ্দেশ্যকে বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে গিয়ে প্রায়ঃশই গণমাধ্যম সন্ত্রাসবাদকে “যৌক্তিক” হিসেবে উপস্থাপন করে। সন্ত্রাসবাদীদের যদি রাজনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিকভাবে নির্ধারিত লক্ষ্য থাকে তাহলে গণমাধ্যমের এরূপ পরিবেশনা জনমনে তাদের প্রতি সহানুভূতির উদ্রেক করতে পারে।
২. সন্ত্রাসবাদকে লেভেলিং করাঃ গণমাধ্যমে সন্ত্রাসবাদীদের বিভিন্ন নামে চিহ্নিত করা হয়। কখনো তাদেরকে “হত্যাকারী” হিসেবে আবার কখনো “মুক্তিসেনা” হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কখনো কখনো এধরনের চিহ্নতকরণের ফলে তাদের বিষয়ে জনমনে ইতিবাচক ধারনা তৈরী হয়।
৩. সন্ত্রাসবাদীদের সংখ্যালঘিষ্ট হিসেবে উপস্থাপনঃ সাধারনত: যে কোন সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীকে তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত ও ব্যাপক জনবল বিশিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনী, সেনাদল, পুলিশ বা সরকারের অন্যান্য এজেন্সীর বিরুদ্ধে লড়তে হয়। সন্ত্রাসবাদীরা আত্মদানে ইচ্চুক- এই দৃঢ়তা তাদের প্রতি সাধারন মানুষের সহানুভূতি তৈরী করে। 
৪. স্টকহোম সিনড্রমঃ সন্ত্রাসবাদের শিকার ব্যক্তিগণ অনেক ক্ষেত্রে নিজেদেরকে সন্ত্রাসবাদীদের লক্ষ্য পূরনে সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে তারা সন্ত্রাসবাদীদের মাঝে ‘মানবিক’ দিক খুঁজে পেতে পারে। গণমাধ্যম তাদের এই অপ্রত্যাশিত আচরণকে দর্শক-শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে ইতিবাচক হিসেবে উপস্থান করতে পারে।


সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমসমূহ যে বিষয়াদি বিবেচনায় নিতে পারে- 
১. সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত তথ্যাদি পরিবেশনের পূর্বে এর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত বিশ্লেষণপূর্বক কোন বিষয়ের উপর অতিরিক্ত গুরুত্বারোপ করা কিংবা বিস্তারিত বর্ণনামূলক স্পর্শকাতর বিষয়াদি উপস্থাপন করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
২. সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠতাকে প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন। যে কোন ঘটনার উভয়দিক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন যাতে দর্শক বা পাঠকগণ সবদিক বিবেচনায় নিয়ে কোন প্রকার প্রভাব ছাড়াই স্বাধীনভাবে নিজস্ব মত গঠন করতে পারেন।
৩. যথাসম্ভব তথ্যের উৎস যাচাইপূর্বক সত্য ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করা মিডিয়ার দায়িত্ব। সন্ত্রাসবাদীরা বিভ্রান্তীকর তথ্য প্রদানের মাধ্যমে জনমনে সন্দেহের উদ্রেক করতে আগ্রহী থাকে- এ কারণে সঠিক ব্যাখ্যাটি তুলে ধরার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।
৪. সন্ত্রাসবাদীদের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে ধারনাবশত: কোনরূপ বিশ্লেষণ করা থেকে গণমাধ্যমকে বিরত থাকতে হবে। কেননা এ ধরনের ধারণামূলক আলোচনা সরকারের সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপকে প্রভাবিত করতে পারে।
৫. যে কোন সন্ত্রাসী হামলার সরাসরি সম্প্রচার থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যেন সঠিকভাবে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে হামলার শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে পারে সে বিষয়ে গণমাধ্যমকে প্রয়োজনীয় সহযোগীতা প্রদান করতে হবে।
৬. সন্ত্রাসী হামলার শিকার ব্যক্তির পরিবার-পরিজনের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করা প্রদর্শন করা প্রয়োজন। এমন কোন বিস্তারিত রিপোর্ট বারংবার প্রচার করা ঠিক নয় যা পরিবারের সদস্যদের জন্য ক্ষতিকর বা স্পর্শকাতর হতে পারে।
৭. গনমাধ্যম কর্মীগণকে তাদের কাজের পরিধি এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের সীমা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সচেতনতা থাকতে হবে। বিষয়ের গভীরতা অনুধাবন করে দায়িত্বশীলতার সাথে ব্যক্তি-জনগণের নিরাপত্তা, দেশের সার্বোভৌমত্ব সংক্রান্ত প্রশ্নে কিংবা তদন্ত বা অভিযানের স্বার্থে প্রকাশযোগ্য নয় এমন তথ্যাদি পরিবেশন থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
৮. সন্ত্রাসবাদীকে বীরোচিতভাবে উপস্থাপনপূর্বক তাদের কর্মকান্ডকে গ্লোরিফাই করা সমিচীন নয়। একই সাথে প্ররোচনামূলক ও ভীতিকর হেডলাইন বা হামলার বিভৎসতাকে উপজীব্য করে কোন ব্যক্তিকে জবাই করে বা ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে হত্যা বা জীবন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার মতো সহিংসতার ছবি বা ভিডিও প্রকাশ থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
৯. মুক্ত আলোচনা ও সরকাররে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সুষ্ঠ গণতান্ত্রিক ধারাকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে কোন জনগোষ্ঠীর মাঝে যাতে ঘৃনা বা ক্ষোভের উদ্রেক না হয় তা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যম সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে। সর্বোপরী সন্ত্রাসবাদের নেতিবাচক দিকগুলি উপস্থাপনের মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে জনমত তৈরী করতে গণমাধ্যম এগিয়ে আসতে পাারে।
১০. গণমাধ্যম সন্ত্রাসবাদ দমনে সরকাররে গৃহীত নানা পদক্ষেপ ও নির্দেশনা প্রচারের মাধ্যমে জনমনে বিশ্বাস ও আস্থা তৈরী করতে পারে। হেট স্পিস বা ঘৃনাবোধের প্রচার এড়িয়ে সকল স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্ত করে গণমাধ্যম tolerance বৃদ্ধির প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে।


উপসংহারঃ কিছু নীতিমালা অনুসরনের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ ও গণমাধ্যমের পারস্পারিক নির্ভরতার নেতিবাচক দিকসমূহ প্রশমিত করা সম্ভব। সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনা হয়তো সম্পূর্নভাবে নির্মূল করা সম্ভব নয় তবে আমাদের প্রতিক্রিয়া ও গণমাধ্যমে তার প্রতিফলন নিঃসন্দেহে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অতিরঞ্জিত প্রচারনা সমাজকে কেবল অব্যাহত ভীতি ও আশঙ্কার দিকে ঠেলে দিতে পারে যা অনিবার্যভাবে ব্যক্তি স্বাধীনতাকে ক্ষুন্ন করবে। এধরনের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আর তা সম্ভব হবে যখন উগ্রবাদীদের প্রচারনা চালানোর মাধ্যম হিসেবে মিডিয়ার ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব হবে। উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াইটি মূলত আদর্শিক। তাই গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে এ লড়াইয়ে কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারে গণমাধ্যম। পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গণমাধ্যম তৎপর হলে সহজেই উগ্রবাদ বিস্তারের ঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব। 
লেখক : ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান

11 thoughts on “সন্ত্রাসবাদ ও গণমাধ্যম

  • October 13, 2019 at 11:25 am
    Permalink

    Hi, very nice website, cheers!
    ——————————————————
    Need cheap and reliable hosting? Our shared plans start at $10 for an year and VPS plans for $6/Mo.
    ——————————————————
    Check here: https://www.good-webhosting.com/

  • January 19, 2020 at 3:43 am
    Permalink

    I visited a lot of website but I believe this one contains something special in it in it

  • January 25, 2020 at 2:53 am
    Permalink

    My brother suggested I might like this blog. He was totally right. This post truly made my day. You cann’t imagine simply how much time I had spent for this info! Thanks!

  • January 25, 2020 at 11:47 am
    Permalink

    Howdy I am so happy I found your site, I really found you by error, while I was browsing on Askjeeve for something else, Nonetheless I am here now and would just like to say thank you for a remarkable post and a all round entertaining blog (I also love the theme/design), I don’t have time to browse it all at the moment but I have book-marked it and also included your RSS feeds, so when I have time I will be back to read a lot more, Please do keep up the excellent work.

  • January 25, 2020 at 1:09 pm
    Permalink

    Nice post. I was checking constantly this blog and I am impressed! Very useful information specifically the last part 🙂 I care for such information much. I was looking for this certain info for a very long time. Thank you and good luck.

  • January 26, 2020 at 2:33 pm
    Permalink

    It’s hard to find knowledgeable people on this topic, but you sound like you know what you’re talking about! Thanks

  • January 30, 2020 at 10:31 pm
    Permalink

    I just couldn’t depart your site prior to suggesting that I extremely enjoyed the standard information a person provide for your visitors? Is gonna be back often in order to check up on new posts

  • February 2, 2020 at 2:13 am
    Permalink

    Thanks for another excellent post. Where else could anyone get that type of information in such a perfect way of writing? I’ve a presentation next week, and I’m on the look for such information.

  • February 3, 2020 at 8:02 am
    Permalink

    Do you have a spam problem on this blog; I also am a blogger, and I was wanting to know your situation; we have created some nice procedures and we are looking to trade strategies with others, please shoot me an e-mail if interested.

  • February 14, 2020 at 5:55 am
    Permalink

    Good – I should definitely pronounce, impressed with your site. I had no trouble navigating through all tabs and related info ended up being truly easy to do to access. I recently found what I hoped for before you know it at all. Reasonably unusual. Is likely to appreciate it for those who add forums or something, website theme . a tones way for your client to communicate. Excellent task.

  • February 19, 2020 at 9:16 am
    Permalink

    I enjoy you because of your own labor on this web page. My mum takes pleasure in getting into research and it’s really obvious why. My partner and i notice all regarding the compelling means you convey rewarding steps through this website and as well as invigorate contribution from people on this subject matter then our daughter is in fact understanding so much. Take advantage of the rest of the new year. You’re the one doing a very good job.

Leave a Reply

Your email address will not be published.